Thursday, April 11, 2019

শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের বিস্মৃতপ্রায় উপন্যাস — "কুয়োতলা"-- সম্রাট গোস্বামী






বইমেলায় বসুমতীর স্টলে শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের বইটা পাই। প্রচন্ড কম দাম। প্রচ্ছদটা দেখে আকর্ষিত হই। শক্তি চট্টেপাধ্যায় কাউকে তাঁর লেখা বই উপহার দিলে বইতে ছাপার অক্ষরে লেখা নিজের নামটা কেটে পাশে স্বহস্তে সই করে দিতেন। শিল্পী পৃথ্বীশ গঙ্গোপাধ্যায় ওইভাবেই প্রচ্ছদটা নির্মাণ করেছেন। দেখে যেন মনে হয় কবির দেওয়া এ এক উপহার।

কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের ঔপন্যাসিক সত্তা অতটাও জনপ্রিয় নয়, বিশেষ করে তাঁর কিছু উপন্যাস তো একেবারেই স্বল্পপঠিত। বিশেষ আলোচনাও হয় না তা নিয়ে। এই বইটায় শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের সাহিত্যকীর্তির সমস্তটার থেকে নির্বাচিত কিছু সংকলিত হয়েছে। সেখানে মৌলিক ও অনুদিত কবিতা তো আছেই। এছাড়াও রয়েছে  উপন্যাস, ছোটগল্প, নিজের কথা এবং ভ্রমণকাহিনী।

যাই হোক, ওঁর "কুয়োতলা" শীর্ষক উপন্যাসটা গ্রন্থে রয়েছে দেখে সরস্বতী পুজোর দিনই রাত্রে পড়া শুরু করে দিলাম। এটা প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৬১ সালে। উপন্যাসটা একেবারেই স্বল্পপঠিত এবং জনপ্রিয়তাবিহীন। অনেকেই নাম শুনেছেন কিন্তু পড়েননি, বোধ করি।

নিরুপম নামের একটা ছেলের মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েন নিয়ে লেখা উপন্যাস। কাহিনী বা কথাবস্তু উপন্যাসটায় বিশেষ নেই। আছে কেবল একজন সদ্য যৌবনত্বপ্রাপ্ত বালকের চেতন-অবচেতন-অচেতনের দ্বন্দ্ব। এদিক থেকে একে মনস্তাত্ত্বিক বা চেতনাপ্রবাহ রীতির উপন্যাস বলা চলে।

পড়তে গিয়ে বারেবারেই মনে হবে যেন কবিতা পড়ছি। পারিপার্শ্বিক অবস্থার বর্ণনা অধিক, কিন্তু কবিতার আঙ্গিকে লেখা এ বর্ণনার মধ্যেও একটা বিশেষত্ব রয়েছে। এক বিষয়ের বর্ণনার সাথে বালকের মনের সংযোগ ও ভাবনার মিলন ঘটিয়ে পরক্ষণেই অন্য প্রসঙ্গে চলে যাওয়ার প্রবণতা। কিন্তু বিষয়গুলো আলাদা আলাদা হলেও খাপছাড়া হয়ে যায় না। কোনো এক অদৃশ্য সুতোয় একসাথে বাঁধা থাকে। তাই কলমের আমগাছের তলায় আওয়াজ শুনে নিরুপম যখন বিশল্যকরণীর কথা ভাবে, তার মনে পড়ে দাদুর কথা — "বিশল্যকরণী থাগলে সাপের উৎপাত কমে।" সাপের ডিম খুঁজতে গিয়ে অতীতে পাওয়া মুরগির ডিম নিরুপমের মনকে পুকুরঘেঁষা বাগানে চরে বেড়ানো হাঁসের প্রসঙ্গে নিয়ে যায়। সেখান থেকে অভ্যাগতদের রাজহাঁসের তাড়া থেকে কুকুর পোষার গল্প; আর তারপর শঙ্খচিল, বকফুল গাছ, হাঁসার বাজে গলার কথা — সবই আসে এক এক করে এপিসোডের মতন। বর্ণনার ভাষাতে কবিতার আদল সুস্পষ্ট।

বইমেলার শেষদিনে কোরকের স্টলে গিয়ে ওদের ২০১৪ সালের প্রাক-শারদ সংখ্যাটা কিনলাম। বিষয়টা মনে ধরল — "দেড়শ বছরের বিস্মৃত বাংলা বই"। এটাও নিয়ে এসেই রাত্রে পড়া শুরু করে দিই। নাম শুনেই গ্রন্থের আলোচনার বিষয়টা বোঝা যাচ্ছে। যাই হোক, "কুয়োতলা" উপন্যাসটা নিয়েও দেখলাম সন্দীপন বিশ্বাসের একটা পাঁচ পাতার প্রবন্ধ রয়েছে, নাম — "শক্তি চাটুজ্জের কুয়োতলা : বাউন্ডুলের উড়ো খই।" উপন্যাসটাকে নিয়ে ছোট্ট অথচ পর্যাপ্ত বিশ্লেষণ।

উপন্যাসটা মোটেই জনপ্রিয় নয়, কিন্তু শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের জীবনের অনুষঙ্গে তাঁর কাব্য তথা সাহিত্যকীর্তির মূল্যায়ণে উপন্যাসটার ভূমিকা অনেক। বিশদে বলি। "কুয়োতলা"র প্রধান চরিত্র নিরুপমের মধ্যে শক্তি চট্টোপাধ্যায়ই আত্মগোপন করে আছেন, প্রকৃতপক্ষে। চার বছর বয়সে তিনি পিতৃহারা হন, তারপর ছেলেবেলা কাটে দাদামশাই ডাঃ সুবোধ গঙ্গোপাধ্যায়ের কাছে। নিরুপমের জীবনটাও এরকমই। পার্টির দলাদলি পছন্দ না করে '৫৮ তে যখন তিনি রাজনীতি ছেড়ে দেন, তখনই নবজাতক কবি লেখেন "কুয়োতলা" উপন্যাসটি। তখনও তিনি তেমনভাবে লেখার জগতে আসেননি। কৃত্তিবাসের সান্ধ্য আসরে এটি তিনি পড়ে শোনাতেন। কালের হিসেবেও এটি তাঁর প্রথম রচনা। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ১৯৬১-এরই মার্চে তাঁর কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয় "হে প্রেম হে নৈঃশব্দ্য"।




উপন্যাসটা অ্যাবস্ট্রাক্ট বা অ্যাবসার্ড ধরনের। শক্তি চট্টোপাধ্যায় কোনোদিনই পপুলার উপন্যাস লেখার দায়বদ্ধতা মেনে চলেননি। কাহিনী নির্মাণ প্রসঙ্গে বলেছেন "গল্প বানাবার আমি কে? এবং আমি কেন? তার জন্য আমার সহযাত্রী বান্ধবরা আছেন, যাঁরা সামগ্রিকভাবে জীবনযাপন দ্যাখেন, চোখ খুলে পরিপূর্ণ তুলে আনেন। আমি একটু তেরছাভাবে দেখি, যতটুকু লাগে ততটুকু নিই। বেশি কথাবার্তার মধ্যে যাই না। বিষয়গুলো পায় পদ্যের পড়শি, তাকে প্রয়োজনমতো গপ্পাকার দেওয়া।" এ উপন্যাসেও আলোচ্য বক্তব্যের বিমূর্ত উপস্থিতি।

সন্দীপনবাবু তাঁর প্রবন্ধে প্রশ্ন করেছেন, "কেন 'কুয়োতলা'-র মধ্যে সমস্ত আধুনিক উপন্যাসের প্রকরণ থাকতেও তা পাঠকের কাছে বিশেষ গ্রাহ্য হয়ে উঠল না।" নিজেই উত্তর দিয়েছেন, "উপন্যাসটি এত অন্তর্মুখীন যে তার অনেকগুলি দরজা অতিক্রম করে তবেই অন্দরমহলে ঢুকতে হয়। বাইরে থেকে মনে হয় সাতমহলা এক ভাঙাবাড়ি।" কিংবা হয়তো বিশ্বসাহিত্যেও বিরল এহেন এক উপন্যাসকে গ্রহণ করার জন্য বাংলা সাহিত্য এখনও প্রস্তুত হতে পারেনি।

যাই হোক, এ ভাঙাবাড়ি এখন বিস্মৃতপ্রায়। কিন্তু আবেগে ভাসলে তো চলবে না। পাঠক যখন লেখার আঙ্গিকে নতুন পরীক্ষা-নিরীক্ষা চায় না, তখন আর কী করা যাবে??

উল্লিখিত দুটি বইয়ের বিবরণ :

১. গ্রন্থনাম — "শক্তি চট্টোপাধ্যায়"
বিষয় — শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের সমস্ত কাব্যগ্রন্থ থেকে নির্বাচিত একাধিক কবিতা।
শ্রীমদভগবদগীতা, ওমর খৈয়ামের রুবাই, মেঘদূত, গালিব, কুমারসম্ভব ও হাইনরিশ হাইনে থেকে অনুদিত কবিতার নির্বাচিত অংশ।
সম্পূর্ণ উপন্যাস 'কুয়োতলা'।
চারটি ছোটগল্প ( হৃদয়পুর, মুড়ি, ঈশেন ও বাবরের আত্মদর্শন )।
নিজের কথা ( স্বগত সংলাপ, পদ্যাপদ্য সম্পর্কে দু এক কথা, কাব্যনাট্য ভাববো? )।
ভ্রমণকাহিনী ( উত্তরবাংলায় ইতস্তত, সিমলিপাল জঙ্গলে, অন্তর্ভ্রমণ আর বহির্ভ্রমণ )।
ছোটদের গল্প ( চলো তিতির সঙ্গে )।
এবং শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের গ্রন্থপঞ্জির সম্পূর্ণ তালিকা।
সম্পাদনা — সমীর সেনগুপ্ত।
প্রকাশক — বসুমতী সাহিত্য মন্দির।
প্রচ্ছদ — পৃথ্বীশ গঙ্গোপাধ্যায়।
মূল্য — ৬০ টাকা।

২. পত্রিকার নাম — কোরক।
সম্পাদক — তাপস ভৌমিক।
সংখ্যা — প্রাক্ শারদ সংখ্যা, ২০১৪।
বিষয় — দেড়শ বছরের বিস্মৃত বাংলা বইপ্রায় চল্লিশটির মত বিস্মৃতপ্রায় বাংলা বই নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা। পরিশেষে এই জাতীয় একশো পঁচিশটি বইয়ের তালিকা।
মূল্য — ১২৫ টাকা।

No comments:

Post a Comment

একনজরে

সম্পাদকীয়

সাহিত্য সমালোচনা- এই শব্দটিকে যদি ভেঙে দেয়া হয়, তাহলে অবধারিতভাবেই দুটো শব্দ চোখের সামনে ভেসে ওঠে। সাহিত্য ও সমালোচনা। সাহিত্যের সমা...

পছন্দের ক্রম