উচ্চবিত্তের সময়ের অভাব, নিম্নবিত্তের অর্থের; কেবল মধ্যবিত্তের কোনও অভাব
থাকে না জীবনে’। অভাব, অথবা প্রাচুর্য। হারিয়ে যাওয়া জীবন অথবা মায়া। কাকে বলব
অভাব, কাকে প্রাচুর্য? আকাশ গঙ্গোপাধ্যায়। পরিচিতি বলছে ভীষণ ‘হাঁ করা ছেলে’। সেখানে ছিপ নিয়ে বসে একদল ছেলেমানুষ সময় ইচ্ছেমত মাছ, জলের কল, অটোওয়ালার
গল্প, জ্যাকেটের বোতাম বা ব্লাইন্ডার ধরবে বলে হত্যে দিয়ে বসে আছে। ‘অস্ত্র উপচার’-এর
কথা বলছি। এপ্রজন্মের অন্যতম শক্তিশালী তরুণ কবি-গদ্যকার আকাশ গঙ্গোপাধ্যায়ের
গদ্যের বই। তবুও প্রয়াস প্রকাশনীর বই। নস্টালজিয়া, হারানো ছোটবেলা, বা
শহরতলি-মফঃস্বল ইত্যাদির গল্প নতুন কিছু নয়। তাহলে কোথায় আকাশ? কোথায় তাঁর ‘সমস্ত
হিসাবপত্তর, সবাইকে দেওয়া কথা’? তার জন্য পাতা খুলতে হয়। পড়তে হয় ...
বইটি দুভাগে সাজিয়েছেন আকাশ। রাইফেল-শ্যুটার হিসেবে একটা সময়ে জাতীয় স্তরে
সক্রিয় অংশ নেওয়া আকাশ চিনেছেন ভারতবর্ষকে। বাবার স্নেহ, সাহচর্য এবং সঙ্গ প্রেরণা
ছিল। সেসব নিয়েই ‘ব্যারেলের জং, বারুদের ঘুম’। কোথাও কোথাও মনে হতে পারে একটা ট্র্যাভেলগ পড়ছি। আগ্রা, ‘টুন্ডলা থেকে গাড়িতে
ঘন্টাখানেক’। বিপজ্জনক দুর্গ। জরুরত পড়লে ইয়াদ করে যাওয়া কিছু
ব্যক্তিগত ভ্রমণপঞ্জি। অথবা পুনে। ‘শীগ্র যুবতী হবে মেয়ের মতো অচেতন এক শহর’।
পুরনো একটা মন ফেলে আসা শহরে তলিয়ে যায়। বদলের ছবি আঁকে। একটা অ্যাবান্ডন্ড
ভেলোড্রাম। পাঞ্জাব। স্বপ্ন। স্বপ্নভঙ্গ। শেষ জাতীয় স্তর খেলার মাঝে
জালিয়ানওয়ালাবাগ, স্বর্ণমন্দির বা ওয়াঘা বর্ডার। জাতীয় কিংবা স্থানীয় স্তরে শুরু
থেকে শেষ অবধি অবিচার, রাজনীতি। একটা রাস্তা। ‘যেখানে আজ কিছুই বাকি নেই’। আমরা ব্যক্তি আকাশকে ছুঁতে পারি।
বুঝতে পারি দিল্লি তাঁকে ‘বহুকিছু দিয়েছে। অনেক আঘাত। অনেক কষ্ট’। কথা কমে। রাত
বাড়ে। ‘একটুকরো দিল্লি এরপর আমি একঢোঁকে গিলে ফেলি, আর মা-বাবা কেউ টের পায় না’। অথবা পশ্চিম ভারত। স্নেহময় এক ফরিস্তার
দেশ। চিঠি। বাপু যাঁহা হ্যায় উঁহাঁ। তাঁর ‘শান্তির গুজরাটে আমরা তখন জনা কুড়ি বন্দুকবাজ’।
মৃতপ্রায় সবরমতী, অথবা এক শহর, পরবর্তী একটা সময়ে গান্ধী মতাদর্শের ঠিক বিরুদ্ধে
অবস্থান করা নারকীয় ভারতবর্ষের এক প্রতিনিধি। আকাশের ভাষায় ‘আমেদাবাদ মাংস চেনে
না’। শহর ঘুরে আসা রাস্তায়, চাঁদমারিতে, অবস্থান বিক্ষোভের বাতিল প্লাস্টিক-গেলাস
বোতলের স্মৃতিতে জুড়ে যায় রাজনীতি, ক্রীড়াক্ষেত্রে নীচতার ‘সেই ট্র্যাডিশন ...’। ভারতীয় ক্রীড়া সংস্থার
কর্মকর্তাদের মানসিক গঠনের ওপর প্রশ্নচিহ্ন স্বাভাবিকভাবেই এসে যায়। কূপমণ্ডূকতা
দিনের আলোর মতো পরিষ্কার হয়ে যায়। স্বপ্নভঙ্গ তখন আর আকাশের একার থাকে না। আর তার
সঙ্গে লেগে থাকে আকাশের নিজস্ব মায়া-শৈলী। রাজধানীর রাতের সি আর পার্ক। “বাবা এসে
পাশে বসত কিছুক্ষণ পর, ‘মাকে একবারও ফোন করেছিস?’ ’’। অথবা ফোর-সাইট রিয়ার-সাইটে লক্ষ্য
নির্ধারণ, ব্লাইন্ডারে বাঁ-চোখ ঢাকা অথবা সিলভার-গ্রে সাপের খোলসের মতো প্রিন্টেড
ব্যারেল। রাইফেল-শ্যুটারের স্বপ্নের ব্যাটন। ট্রেনের কামরায় সঙ্গে নিয়ে চলা একটা
মস্ত বড় দেশ। যেখানে
‘সারা ভারতবর্ষের ছেলেপুলে যে যার নিজের ভাষায় চিৎকার করে গান শোনাচ্ছে কাকে যেন’
...
‘মদ্যপেরা মনখারাপ নিয়ে অ্যাস্ট্রোটার্ফে যায়’। আর আকাশ
স্বপ্নভঙ্গের নেশা শরীরে মাখেন। লালন করেন। মনখারাপ হয়। সেই মনখারাপ নিয়ে যার লেখালেখির পৃথিবীতে
জন্ম হয়। রিজুভিনেশন। জন্ম হয় নিরোর বেহালায়। সঙ্গে পত্রিকা, খড়কুটো, মা-বাবা,
বন্ধু, প্রেমিকা। ‘কেউ স্বনামে, কেউ সাংকেতিকতায়’। থাকে উত্তরপাড়া। ‘একদিকে গঙ্গা
অন্যদিকে রেললাইনের ঠেকনো দিয়ে শুইয়ে মা যেন দরজা খুলে কাপড় জামা তুলতে গেছেন
ছাদে’। মনে হয় আমাদের সব্বার আসলে তো একটাই ঘর, ছাদ, স্মৃতিচারণ। যেখানে ‘সমস্ত
সরকারি স্কুলের বারান্দাই হেডস্যারের ঘরের দিকে মুখ করে থাকে’। মায়াবাদের জন্ম হয়
লেখকের নিজস্ব সাবলীলতায়। ‘এমন আপেলগাছ সচরাচর বন্ধু ছড়ায়। আমরা তার ছায়ায় বসি,
কখনও ছায়াকে বসতে দিই পাশটায়’। তুমুল এক বান্ধবজীবনের কথা অস্ত্র-উপচারের পাতায়
পাতায়। অপেক্ষার ঘাট। যেখানে সাহানা, শুভম, সুশোভন আসছে। সখ্য বাড়ছে। বাড়ছে
আত্মীয়তা। মনের
কাছাকাছি থাকা নিজেদের গল্প লেখেন আকাশ। নিজেকে চেনান। আঙ্গিকে, গদ্যের নিজস্ব
গঠনে, রসবোধে। ‘আমি
মাকে মানি, মা মানে এইসব, অতএব আমি এসবও মানি পরোক্ষভাবে’। পুরনো শহরের নাগরিক
মুখেদের সঙ্গে আলাপ করান আমাদের। আসে মিঠিদি, সৌরভদা, বদলে যাওয়া বাজারের দিক
কিংবা এই সেদিনও ভীষণ জ্যান্ত এক শরীর থেকে লাশ হয়ে যাওয়ার গল্পকথারা। ভক্তদাসের
গান আর গানের ভেতর দেখতে পাওয়া পিঁপড়েয় ছেঁকে ধরা পা। আসেন থার্টি বাই ওয়ানের সেই
কন্ডাক্টর। ‘পুরুষেরা
শাঁখা-পলা পরে না বলে তাই বুঝতে পারিনি ওঁর সেই সংসার আর নেই’। আমাদের আলাপ হয়
হয়তো বা আমাদেরই বড় হওয়া ছেলেমেয়েদের সঙ্গে। ‘স্কুলের ফর্ম ফিলাপে বাবার নামে লেট জুড়ে দিতে
অস্বস্তি হবে না তাদের’। রাস্তা পেরোতে সময় ভুল করা এক মাঝবয়েসীর মন, তাঁর
পান্না জ্বলার অপেক্ষায় আশাবাদের দোটানা। অটোওলাদের ভয়ঙ্কর স্মৃতির মাঝে এক
দৃশ্যের জন্ম। ‘এই সেদিন একটা গেল, তাকানো যায় না জানো’। কখনও তুমুল দল বেঁধে দীঘা
যাওয়া যুবকের চালশে পড়ার সর্বংসহা নিয়তির মতোই এসে পড়ে অনিবার্য একাকীত্ব। যে
কাউকে ঘাঁটাতে চায় না। ‘এই মেঘ, এই জলবায়ু, সরকার, মা-বাবা, মাকড়সা কাউকেই না’।
যখন অস্তিত্ব বলতে সম্বল শুধুমাত্র নিজের আলোটুকু, একটা রাতের ট্রেন, সঙ্গী,
প্রেমিকা, ‘সে চলে গেলে আমি দেখি আমার দুদিকে অন্ধকার’। হারিয়ে যাওয়ার গল্প।
অবিশ্বাসেরও। যেখানে ‘মানুষ তার প্রাপ্যটুকু পাচ্ছে না’। আকাশের কথায় ‘কমে আসছে
ছায়া, চন্দ্রমল্লিকা, ডালিয়া আর বাবাদের আগের প্রজন্মের লোকজন’। অথবা ‘হুইলচেয়ারে
ঠাকুমা, মুখোমুখি বাউল আর আমরা। ক্রমশ বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বুঝতে শিখছি মাটির
দিকেই এগিয়ে যাচ্ছি সবাই’। থাকে বেরিয়ে আসার গল্প। ছোট বড় ট্রেলার। একদল ছেলেমেয়ে
যারা ‘অফিসের জানলায় একটুকরো পাহাড় দেখে ফেলছি অসময়ে’। নিজের গ্রাম বরাভূম। বিস্তৃত প্রান্তর জুড়ে তার
জ্যোৎস্না। ফেরার রাস্তা। ‘সূর্য থেকে বেরিয়ে এসে একটা সাইকেল পাহাড়ি রাস্তা দিয়ে
পিছিয়ে যাচ্ছে আমাদের চেয়ে’। আঃ, মায়াময় উচ্চারণ। স্মৃতিচারণ। আর ‘স্মৃতিচারণের
কোনও শব্দসীমা হয় না’। ভাগ্যিস হয় না ...
আকাশ নিজের গল্প লিখেছেন। নিজেদের গল্প লিখেছেন।
মানভূম থেকে সুতানুটির গল্প। তাঁর ক্রীড়া-জীবনের দিল্লি-আগ্রা হয়ে লেখক-প্রকাশক
বিবর্তনের প্রিয় কলেজস্ট্রিট-বইপাড়া, পত্রিকা আঁকড়ে বেঁচে থাকা মৌলালি-বালিহল্ট,
নিজস্ব মানভূম, উত্তরপাড়া অমরেন্দ্র বিদ্যাপীঠ সবকিছুই। গদ্যগুলির বিষয়নির্বাচন,
নামকরণে এসেছে গোপন এক হিউমার, রোম্যান্স। ‘আগ্রায়ণ’, ‘ভাড়া ছাদ, ভাড়াটে দেবতা’,
‘ঈশ্বরের ভেজা ডানা’, অথবা ‘মৃত্যুভাব, চন্দ্রস্নাত ভাব’। এঁকেছেন পরাবাস্তব ছবি। পাতায়
পাতায়, প্রচ্ছদে যার প্রকাশ। অনির্বাণ সরকারের আলোকচিত্রে আকাশের নিজের প্রচ্ছদে
লেখকের নিজস্ব এক অন্তর্ভেদ। আলোর সন্ধান। যে আলো ছড়িয়ে পড়ুক তাঁর হাতে, সত্তায়,
পরবর্তী প্রজন্মে ...
‘রাতের সবাই ঘুমোলে ঘুলঘুলি দিয়ে আসা আলোর দিকে
তাকিয়ে থাকি, এ আলো আমায় আমার বাবা চিনিয়েছে, তাঁকে তাঁর বাবা, হয়তো আমিও চেনাব
আমার সন্তানকে; কিন্তু চাপিয়ে দেব না, বলে দেব না ভালোবাসতে শেখো এইসমস্তকে’।
অস্ত্র উপচার
আকাশ গঙ্গোপাধ্যায়
প্রচ্ছদ- আকাশ গঙ্গোপাধ্যায়
তবুও প্রয়াস
১২৫ টাকা
No comments:
Post a Comment