Friday, April 12, 2019

মাটির সেতারঃ এক বিলীয়মান জগতের বিষণ্ণ সৌন্দর্য -শৌভ চট্টোপাধ্যায়







জগন্নাথদেব মণ্ডলের লেখার সঙ্গে আমার পরিচয় হয় ফেসবুকের মাধ্যমেই। সম্ভবত, কবি ও বন্ধু রাকা দাশগুপ্ত প্রথম পড়িয়েছিল তার লেখা, স্বতঃপ্রণোদিত হয়েসেই থেকে, যখনই পেরেছি, খুঁজে-পেতে পড়েছি এই অতি-তরুণ লেখকের লেখালিখি। আমার চেয়ে বয়সে প্রায় চোদ্দ-বছরের ছোট সে, সদ্য-কৈশোরোত্তীর্ণ বললেও ভুল হয় না। তবুও, তার কবজির জোরে, বারবার বিস্মিত হয়েছি। এ বছর, ‘ধানসিড়ি’ থেকে প্রকাশিত হয়েছে জগন্নাথের প্রথম বই—“মাটির সেতার”। সেই বইয়ের পাঠ-শেষে, জগন্নাথের লেখার প্রতি আমার মুগ্ধতা বেড়েছে বই কমেনি।
খেয়াল করবেন, এতক্ষণ, আমি কিন্তু সচেতনভাবেই 'লেখা' শব্দটি ব্যবহার করলাম, 'কবিতা'-র পরিবর্তে। কেননা, আমি সত্যিই জানি না, জগন্নাথের এইসব লেখা, নির্দিষ্ট ও সঙ্কীর্ণ অর্থে, কবিতা কি না। অবিশ্যি, কবিতার প্রকৃত সীমা কে আর কবে পুরোপুরি নির্দিষ্ট করতে পেরেছে। তবে, আমি যেটা বলতে চাইছি, সেটা এই যে, প্রায়শই, জগন্নাথের লেখায়, হীরকখণ্ডের মতো অতি-ঘনসংবদ্ধ কাহিনীর আভা ফুটে ওঠে। মনে পড়ে, অস্ট্রিয়ার দুই যুগন্ধর লেখক, রবার্ট হ্বালসার এবং পেটার অল্টেনবার্গের সেইসব অত্যাশ্চর্য গল্প বা স্কেচ-জাতীয় গদ্যগুলির কথা। কিংবা, কাফকার প্যারাবল, অথবা, খিমেনেথের “প্লাতেরো ও আমি”-র ছোট ছোট লেখাগুলি। অথচ, পরক্ষণেই দেখি, উঠোন পেরিয়ে, কঞ্চির বেড়ার ওপাশে যাওয়া-মাত্র, লেখাগুলির কাঁধে এক-জোড়া চিত্রবিচিত্র ডানা গজিয়ে উঠেছে, আর সন্ধ্যের আবছা আলোয়, তারা আমাদের দৈনন্দিন বাস্তবতার মাটি ছাড়িয়ে, কোনো এক জাদুবাস্তব আকাশের দিকে উড়ে যাচ্ছে হই-হই করে। যেভাবে, মার্কেজের গল্পে, সুন্দরী রেমেদিওস উঠোনে কাপড় তুলতে গিয়ে, দমকা হাওয়ায় উড়ে গিয়েছিল শূন্যে, আর সশরীরে স্বর্গারোহণ করেছিল। কোনোদিন ফেরেনি আর।
মার্কেজ এবং তাঁর বহু-চর্চিত জাদুবাস্তবতার উল্লেখ এখানে অপ্রাসঙ্গিক নয়। কেননা, জগন্নাথের লেখার পরতে পরতে মিশে থাকে এক পরাবাস্তব জগতের আঘ্রাণ। এ সেই জগৎ, যেখানে মানুষ সাপ হয়ে যায়, পুরুষের শরীরে ফুটে ওঠে সতীচিহ্ন, মৃত পূর্বপুরুষ কাকের ছদ্মবেশে ভাত খেতে আসে। আর, এই সমস্ত ঘটনা, জগন্নাথ লিখে রাখে এক আশ্চর্য মেদুর, অথচ নির্লিপ্ত ভাষায়। এই ভাষা সাংকেতিক ও প্রতীকনির্ভর, এই ভাষার চলনে ছন্দ রয়েছে, এই ভাষায় ক্রমাগত বদলে যেতে থাকে শব্দের অর্থ। সাধারণ দেখা-শোনার জগতের ওপর অপরিচয়ের সর পড়ে। আর এভাবেই, গদ্যের মৃন্ময় শরীরে প্রাণ-প্রতিষ্ঠা হয় কবিতার। অর্থাৎ, কাহিনীকথন বা ন্যারেটিভকে আশ্রয় করে বেড়ে-ওঠা এইসব লেখা, শেষ অবধি, ছাপিয়ে যায় ন্যারেটিভের গণ্ডীকেও। এবং গুলিয়ে দিতে চায় গদ্য ও কবিতার অস্পষ্ট সীমারেখাটি।
একটি উদাহরণ দিই। বইয়ের ৬ নং কবিতা শুরু হচ্ছে এইভাবে—“হিরাসায়রের অতল জলে গর্ভপাত হয় রাঙাবউয়ের। নাকে নথ পরা কালবোশ মাছ নাড়ির বাঁধন ছিঁড়ে দিয়েছিল। পাঁকের নীচে তলিয়ে যায় সদ্যোজাত সন্তান। জাল ফেলেও খুঁজে পাওয়া যায়নি।“ এই শুরুর মধ্যে, একটা টানটান ছোটগল্পের বুনোট রয়েছে। হয়তো-বা রয়েছে, খানিকটা রূপকথার আমেজও। অথচ, আরেকটু এগোতেই—“কাদায় ঢাকা পড়া নতুন নাভি আর নাসারন্ধ্র থেকে, জন্ম নেয় শাপলাফুল। কুড়ানিমাসি ওই শাপলা ফুল দিয়ে ঢ্যাপের খই ভেজেছে। রানিদি কোঁচড় ভরতি খই নিয়ে দত্তদের বাড়ি চলে গেছে। ওদের সাদাকালো টিভিতে জন্মভূমি দেখতে দেখতে মুঠো ভরতি ভাই-খই খাবে রানিদি।“ এইখানে এসে, গল্পটি আর সাধারণ গল্প থাকে না। তার ভেতর থেকে উঁকি দেয় পুরাণকল্পের ছায়া। যেন এক নতুন সৃষ্টিতত্ত্বের প্রস্তাবনা হচ্ছে এ-লেখায়। আবার, সেই পুরাণপ্রতিমার পাশাপাশি, সাদা-কালো টিভিতে জন্মভূমি দেখার চমকপ্রদ বৈপরীত্যটিও লক্ষ্যণীয়। এই বিরোধাভাস, আমাদের পাঠের ক্ষেত্রটিকে এক-ধাক্কায় সম্প্রসারিত করে, অনেকান্ত করে তোলে। কোথাও কি নারায়ণ মুখোপাধ্যায়ের কথা মনে পড়ল, পাঠক আপনার?
আবার অনেকসময়ে, প্রত্যক্ষ কোনো যাদুবাস্তব উপাদান না-থাকলেও, শুধুমাত্র ভাষার মায়াটানে, লেখার মধ্যে বহুস্তরীয় অর্থের সম্ভাবনা তৈরি হয়। উদাহরণ-হিসেবে, ৩৮ নং কবিতাটি পুরোটা উদ্ধার করার লোভ সামলানো গেল না—
“চোখের সামনে থেকে ইলিশ খেয়ে গেল বেড়াল। বাস্তুসাপের গায়ে ভাতের গরম মাড় ছুড়ে দিয়েছে ঠাকুমা। মা মেঘ-থমথমে মুখ নিয়ে বলল, যত অজাত-কুজাত আমার কাছে আইস্যা জড়ো হয়। একখান বছর বিয়ানি ছাগল, এই বুড়িখান আর আমার দিকে আঙুল তুলে বলল, এই ধাড়ি পোলাখান।
“ছাগলের জন্ম অজযোনি থেকে। ঠাকুমা জন্মেছেন শ্রীমতী ননীবালা দাসীর গর্ভ থেকে। আমার জন্ম মায়ের নিজস্ব অংশ থেকেই, কেউ-ই অজাত-কুজাত নই এটা ভেবে জিভ বের করল মা। তারপর লজ্জায় গুটিশুটি মেরে নীল অপরাজিতাগাছের মতো দুলতে লাগল হাওয়ায়। আমিও হয়ে গেলাম দুলতে থাকা নীলগর্ভফুল। তাম্বুরা বাজতে লাগল দূরে কোথাও।“
এই অকিঞ্চিৎকর গার্হস্থ্য নাটকটি কি, শেষ অবধি, শুধুই একটি সাংসারিক কলহের বর্ণনা হয়ে রইল? না কি, দূরে ওই তাম্বুরার আওয়াজে, মানুষের সঙ্গে মানুষের, মানুষের সঙ্গে প্রকৃতির, আরো ব্যাপক কোনো সম্পর্কের সম্ভাবনা ধ্বনিত হল?
পশ্চিমী সমালোচকদের ধাঁচে, পরাবাস্তবতা, জাদুবাস্তবতা ইত্যাদি তত্ত্বের অবতারণা যতই করি না কেন, যতই নাম নিই দিকপাল পশ্চিমী লেখকদের, জগন্নাথের লেখার আবহ যে পূর্ণত বাঙালী, বাংলার জলে-হাওয়ায়-ঐতিহ্যে পুষ্ট, এ-কথা কিছুতেই বিস্মৃত হতে পারি না। সেদিক থেকে, দক্ষিণারঞ্জন কিংবা ত্রৈলোক্যনাথের সঙ্গেই বরং এদের নাড়ির টান। আবার, এর পাশাপাশি, এটাও উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, জগন্নাথের লেখার স্থানিক পটভূমি গ্রামবাংলার হলেও, তা কিন্তু কোনো নির্দিষ্ট কালখণ্ডে আবদ্ধ নয়। বরং, সময়ের অনেকগুলো সমান্তরাল প্রবাহ তার লেখার মধ্যে বহমান। যাদুকরী এই লেখার জগতে, একইসঙ্গে ঘুরে বেড়ান দেবী মনসা, ধূমাবতী, চণ্ডীদাস, রবীন্দ্রনাথ, শিবকালী ভট্টাচার্য কিংবা জর্জ বিশ্বাস।
 মার্কেজের মাকোন্দো যেমন গোটা লাতিন আমেরিকার প্রতীকী রূপায়ণ, জগন্নাথের কবিতার স্থানাঙ্কটিও এক আবহমান, শাশ্বত, লৌকিক বাংলার। রাঢ়-পুণ্ড্র-বঙ্গ-সমতট মিলিয়ে যে-অখণ্ড বাংলা, জগন্নাথের লেখা যেন তার অন্তর্গূঢ় আত্মাকে ধারণ করতে সক্ষম হয়েছে। আমরা, যারা শহরে মানুষ, ঔপনিবেশিক শিক্ষার আলোকপ্রাপ্ত, তারা এই লৌকিক বাংলার অস্তিত্বটি প্রায় ভুলে যেতে বসেছি। ঢ্যাপের খই, মনসা-পুজো, কৌশিকী অমাবস্যা, রাধাষ্টমীর তালের বড়া—আমাদের কাছে এসবের উল্লেখ, পরণকথার মতই, এক সুদূর ও বিলীয়মান জগতের বিষণ্ণ সৌন্দর্য বয়ে আনে। এই বিষণ্ণ সৌন্দর্যের ছায়া পড়ে জগন্নাথের লেখাতেও। কখনো-কখনো মনে হয়, যেন তার মাথায় আশীর্বাদের হাত রেখেছেন বিভূতিভূষণ কিংবা ‘রূপসী বাংলা’-র জীবনানন্দ। জগন্নাথের দেখার চোখ, বাংলার জল-মাটি-মানুষ-পশুপাখি-গাছপালার প্রতি তার নিবিড় মমত্ববোধ যেন এঁদেরই উত্তরাধিকার বহন করছে। এই বইয়ের একটি লাইন--"শুধু ভালোবাসা জেগে থাকবে গাঢ় চোখের মতন"--জগন্নাথের লেখার ক্ষেত্রেও বড় বেশিরকমের সত্য বলে মনে হয়।

মাটির সেতার
জগন্নাথদেব মণ্ডল
ধানসিড়ি, মূল্যঃ ১২৫ টাকা


No comments:

Post a Comment

একনজরে

সম্পাদকীয়

সাহিত্য সমালোচনা- এই শব্দটিকে যদি ভেঙে দেয়া হয়, তাহলে অবধারিতভাবেই দুটো শব্দ চোখের সামনে ভেসে ওঠে। সাহিত্য ও সমালোচনা। সাহিত্যের সমা...

পছন্দের ক্রম