Saturday, April 13, 2019

নাশকতার বারান্দা- অমর মিত্র






     গল্প  উপন্যাসের দিন বদল হয়ে যাচ্ছে কীভাবে হচ্ছে, অবশ্যই লিখনে লিখন শৈলীতে, কথন ভঙ্গীতে আর লেখকের ভিন্ন পথে যাত্রার  ইচ্ছা, ‘ভেঙেচুরে নতুন করে গড়ি’, আলাদা করে ফেলি নিজেকে, তা দিয়েই এসবেই  আমাদের নবীন ঔপন্যাসিকরা  নিজেদের  আলাদা করে নিতে চাইছেন এই উপন্যাসিকরা কেউ সবে চল্লিশ পেরিয়েছেন, কেউ সামান্য বেশি কিসে তাঁরা স্বতন্ত্র হয়ে উঠেছেন, এপার এবং ওপারে ? বাংলাদেশে যদি বিষয় বৈচিত্র, জীবন বৈচিত্র হয়ে ওঠে উপন্যাসের বিষয়, আমাদের এপারে তা হয়ে উঠেছে কল্পনা, দর্শন নিয়ে এক নতুন ভুবন  আমি সদ্য পঠিত এক উপন্যাসের ভিতরে যে গোলমালের সন্ধান পেয়েছি, তা থেকে মনে হয়েছে,  বিষয়কে তিনি নিজে নির্মাণ করেছেন, বিষয়ান্তরেও নিজে প্রবেশ করেছেন নাশকতা বলতে আমি কী বুঝি ? গোলমাল পাকিয়ে দেওয়া, পড়তে পড়তে থৈ পাচ্ছি না, কোথায় যাবে এই কাহিনি, এর বাস্তবতা তো সেই বাস্তবতা নয়, যা অহরহ ঘটে থাকে, তার নানা রকম রাস্তা আমরা দেখে অভ্যস্ত হিন্দোল ভট্টাচার্যর উপন্যাসের নামটিইনাশকতার বারান্দা তিনি যে বাস্তবতা নিয়ে আরম্ভ করেন, তা সময় চিহ্নিত হয়েও সময়কে পরিত্যাগ করেছে অনায়াসে আবার পরিত্যাগ না করলে সময়কে এই ভাবে ধরা যেত কি না, বলতে পারি না আমি যেন দূর থেকে দেখি, সময় থেকে দূরে সরে গিয়ে যে উপন্যাস পড়তে পড়তে চিনে গেছি উপন্যাসের চলনের পথ, হিন্দোলের উপন্যাস তা থেকে আলাদা ফলে আমাকে তিনি ভাবিয়েছেন নগরবাস আমাদের উপন্যাসে যে নগরের ছায়া ফেলেনি( ব্যতিক্রম আমার পড়া, জয়ন্তর ভয় ভয়, মৃত না জীবিত কিংবা অলোক গোস্বামীর বাতিল নিঃশ্বাসের স্বর, এর বাইরেও থাকতে পারে ) তার অনেকটাই সত্য হিন্দোল যে উপন্যাস লিখেছেন, তা আমার চেনা জগতকে অচেনা করে দিয়েই চেনা জগত মানে এই চেনা শহর চেনা সমাজ চেনা শহর আবার আমার চেনা উত্তর শহরতলী চেনা সমাজ মানে, বামফ্রন্ট, তৃণমূল, রাজনীতি, ক্ষমতা, আদর্শ, আদর্শহীনতা--সব
    'দিন ধরে পড়ছিলাম এই উপন্যাস উপন্যাস তা আয়তনে ছোট হোক বা বড় হোক, তা রচনা আসলে বাঘের পিঠে চেপে বসা লেখক  কোথা থেকে কোথায় যাবেন তা নিয়েই এক সময় সংশয় তৈরি হয়ে যেতে পারে পাঠের সময় আমি উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছি, এই উপন্যাস কোথায় গিয়ে থামবে ? আমাকে এক ভুলভুলাইয়ার ভিতরে নিয়ে গেছেন লেখক ভুলভুলাইয়াতে প্রবেশ করেছেন, বেরুবার পথ খুঁজে বের করাই তো লেখকের কাজ আরম্ভ করলেন তো শেষ করবেন কোথায় ? আপনি কি জেনে বুঝে , ছক কষে লিখতে আরম্ভ করেছেন ?  আজ থেকে তিরিশ বছর আগে দিল্লিতে প্রবীণ মরাঠী  লেখক গঙ্গাধর গ্যাডগিলের সঙ্গে এই নিয়ে তর্কে জড়িয়ে গিয়েছিলাম তিনি বলছেন, তুমি,পুরোটা ছকে নিয়ে লিখতে বসো, উপন্যাস লেখার পথ সেইটা আমি যে তা পারি না, আমি একটা সূত্র ধরে লিখতে আরম্ভ করি, লিখতে লিখতেই উপন্যাস তৈরি হতে থাকে কাহিনির কথা বলছি কাহিনিবৃত্ত নয় অবশ্যই সবই মনে পড়ছে ক্ষুদ্রকায় উপন্যাস  নাশকতার বারান্দা পড়তে গিয়ে পড়তে পড়তে আরো এক প্রশ্ন তৈরি হয়,উপন্যাস কি শেষ হয় ? লিখতে লিখতে মনে হয় না, যেখানে লেখক থামলেন, সেখান থেকেই আর এক আরম্ভের সূচনা হতে পারে যা ঘটেনি, তা ঘটিয়ে দিয়ে লেখক আর এক স্বপ্ন বৃত্তান্তর সূচনা করে দিতে পারেন প্লেগ নির্মূল হবার পর প্লেগের বীজানু যেমন ঘুমিয়ে  ছিল  লেপ তোষক কাঁথা মাদুরের ভিতর নাশকতার বারান্দা পড়তে পড়তে আমার এমন মনে হয়েছে আর নাশকতা ঘুমিয়ে আছে যেন এই গোলমাল পাকিয়ে দেওয়া উপন্যাসে
   উত্তর শহরতলী,, পাইকপাড়া, নর্দার্ন এভিনিউ, দমদম রোড, উমাকান্ত সেন লেন, নাগেরবাজার, গোরাবাজার, ক্লাইভ হাউস, বন্ধ হয়ে যাওয়া এইচ, এম, ভি, এক বিস্তীর্ণ উত্তর শহরতলীকে নিজের মতো করে ধরতে চেয়েছেন লেখক আরম্ভটি চমৎকার,  ইতিহাসের এক লুকিয়ে থাকা গল্প খুঁজে বের করেছেন তিনি দমদম রোড, নাগের বাজারে যার আরম্ভ, শেষ হয়েছে চিড়িয়া মোড়ে, তার  এক নাম ছিল উমাকান্ত সেন লেন, ঘুরে ঘুরে কোন পথ দিয়ে সে যে বি টি রোডে পৌঁছত ! রাস্তাটি বহু পুরোন, রবার্ট ক্লাইভ পরে বিটি রোড এবং যশোর রোড জুড়ে দিয়ে তার নাম করে দেন দমদম রোড হ্যাঁ, এক চিলতে উমাকান্ত সেন লেন রয়েছে দমদম রোডের খুব কাছে পাইকপাড়ার ভিতরে তার ভিতরে কি আড়াইশো বছর আগের বাতাস ঘোরে ফেরে ?  তো ইতিহাস আর বাস্তবতা, দুই-কে পাশাপাশি রেখে লেখেননি লেখক এই উপন্যাসে এক অতীত আছে, যা কি না ভিনদেশের মতোই ( বাংলাদেশের লেখক মোজাফফর হোসেনের থেকে এই শব্দ বন্ধ ধার করে নিলাম) লেখক কী চমৎকার বলেন,  ইতিহাস ? ইতিহাস কাকে বলে ? নিজের পায়ের শব্দে মনে হয় অতীত পিছু নিয়েছে সেই কি ইতিহাস ?”
      অকেজো হয়ে আসা কিডনি ট্রান্সপ্লান্ট না হলে এ বাড়ির মেয়েটি, দেবযানী বাঁচবে না একান্নবর্তী পরিবারের একজন স্কুল টিচার, অন্যজন তেমন কিছু করে না, কবিতা লেখে সুধীরের কন্যা দেবযানী সুধীরের ছেলে কৈশোর অতিক্রান্ত যুবক রাজা সাইকেলে টো টো করে টিউশানি যায়, সামনে এইচ এস পড়ায় যত না মন, তার চেয়ে বহু বিষয়ে আগ্রহ সুধীর কমিউনিস্ট পার্টি করে হ্যাঁ, পার্টি ক্ষমতাচ্যূত হলেও সে পার্টি আর আদর্শ ত্যাগ করেনি বহু কমরেড ক্ষমতার লোভে তৃণমূল দলে চলে গেছেন পার্টি করে সুধীর তার অবস্থা পরিবর্তন করতে পারেনি সুধীরকে দলবদল করা কমরেড বলছে আত্মসমর্পণ করতে তাহলে সব ব্যবস্থা করে দেবে  মেয়ের কিডনি ট্রান্সপ্ল্যান্ট করতে অনেক টাকা দরকার সুধীরের ভাই  কবি সুবীরও প্রতিষ্ঠান বিরোধীই হয়ে থাকল, ফলে কবিতা নিয়ে বেশি দূর যেতে পারেনি তার মনে হচ্ছে প্রতিষ্টানে  আত্মসমর্পণ করে  খুব চেনা ছবি  এই ছবি নিয়ে কতদূর যাওয়া যায় ?  চেনা এই ছবি দেখতে দেখতে মনে হতে পারে, এ কাহিনি তো অনেক পুরোন গল্পটা না হয় নতুন, কিন্তু আদতে তা আমরা বহুবার শুনেছি এইভাবেই  হ্যাঁ, তাই কিন্তু কাহিনি বদলে যায় বন্ধ  এইচ এম ভি, কারখানার ভিতরে প্রবেশের পর ২৫০ বছর আগের এক বাস্তবতার সঙ্গে সমকালীন বাস্তবতা মুখোমুখী হয় চেনা গল্প ক্রমশ হারিয়ে যেতে থাকে সেই  সময় আর এই সময় নিয়ে ঔপন্যাসিক, তাঁর নানা রঙের রুমাল বের করে আনতে থাকেন ইদানীং কিছু বিজ্ঞান অথবা অবিজ্ঞান মেশামেশি করে আধিভৌতিক থ্রিলার লেখার ধুম লেগেছে তা নিয়ে ভালো এবং মন্দ দু কথাই বলা যায় উপন্যাস রচনার নতুন এক পথ যেমন খুঁজে বের করতে চাইছেন নবীন ঔপন্যাসিকরা, আবার থ্রিলার লিখে জনপ্রিয়তার পথে হাঁটাও এক পথ দেশ-কাল, সমাজ, পৃথিবী, জীব জগত, জীবন-জন্ম এসব নিয়েই তো উপন্যাস থ্রিলারে যদি তা না ছোঁয়া হয়, তবে সেই উপন্যাসে আমি মগ্ন হব কেন ?  নাশকতার বারান্দাএসব ছুঁয়েছে, কল্প কাহিনির ভিতরে হারিয়ে যায়নি এর সব কথা নতুন চিন্তার জন্ম দিয়েছে       
   এই উপন্যাস কি কল্পবিজ্ঞান ? ২৫০ বছর আগের পৃথিবী থেকে হেঁটে আসে যে মানুষ এই সময়ে, তাকে নিয়ে কতদূর যাবেন, যেতে পারবেন লেখক, তা নিয়ে সংশয় জন্ম নিয়েছিল মনে বাঘের পিঠে উঠে পড়েছেন লেখক, এখন ?  আমি কাহিনির ভিতরে যাব না তা থাক পাঠকের জন্য কিন্তু কিছু কথা তো তবু বলার থাকে,
যে যুগে প্রবেশ করেছি আমরা তা কি স্বপ্ন ? না এই স্বপ্নই বাস্তব না কি এই  বাস্তবতাই  স্বপ্ন?  আবার কাহিনির ভিতরে সময় থামিয়ে দেওয়ার যে আশ্চর্য  বিবরণে প্রবেশ করেছেন লেখক, তা-ই লন্ডভন্ড করে দিয়েছে চেনা সমস্ত ছক আইজাক অ্যাসিমভের এক কল্প কাহিনিকে মনে এল আমার এমন নয়, সে এক যুদ্ধবাজের ভোটে জিতে প্রেসিডেন্ট হওয়ার কাহিনি, তার জন্ম হয়েছিল অতীতের এক বিন্দু ব্যতিক্রমে এই উপন্যাসে যে বিদ্রোহ তা হলো সময়কে থামিয়ে দিয়ে সেই পরামর্শ আসে অতীতের মানুষের কাছ থেকে হ্যাঁ, এখানে সেই আড়াইশো বছর আগের সময় এক ভিনদেশ সময় লুকিয়ে ফেলে সমস্ত ঘেয়ো সিস্টেমকে থামিয়ে দিয়েছিল মানুষ এই কলকাতায় তারপর যা হয়, তা আছে উপন্যাসে সেই অতীত থেকেই আসে কিডনি নিয়ে একটি মেয়ে দেবযানী তার কিডনি নেয় তারপর যা হয়, উপন্যাসে আছে হয়তো কোথাও ইচ্ছা পূরণ হয়েছে কিন্তু পাঠকই যে সংশয়ে পড়েছেন, বাঘের পিঠ থেকে নামবেন কী করে লেখক ?
  মনে পড়ে যাচ্ছে গঙ্গাধর গ্যাডগিল মহাশয়ের সেই পরামর্শের কথা এই উপন্যাস কিন্তু ছক বেঁধে লেখা কাহিনি নয় তরুণ লেখকের নিজের অর্জিত পথে অনিশ্চিত যাত্রা হ্যাঁ, উপন্যাস এক অনিশ্চিত যাত্রাও নিশ্চয় আর সেই যাত্রার ভিতরেই থেকে জীবন ও জন্ম অনুসন্ধান, লেখকের দর্শন
    নতুন প্রজন্মের লেখককে আমি বুঝতে চাইছি বুঝতে পারছি নিজের মতো করে আর মনে হচ্ছে  এই লেখক ভেবেছেন, সময়, দুঃসময়, জীবন, রাজনীতি, দেশকাল নিয়ে আশ্চর্য কাহিনি হ্যাঁ, প্রথম লেখার ছাপ আছে এক এক জায়গায় একটু বেশি কথা আছে, তা নিয়ে আমার মাথা ব্যথা নেই আসলে উপন্যাস কোথায় পৌঁছল? আমি ভাবি উপন্যাস এক প্রবহমান কাহিনি, যার কোনো শেষ হয় না শেষ থেকে আবার পরিণতিহীন শুরু করা যায় 


 নাশকতার বারান্দা ঃ হিন্দোল ভট্টাচার্য
প্রকাশক ঃ সোপান
প্রচ্ছদ- দেবাশিস সাহা 
মূল্যঃ ২০০টাকা 

2 comments:

  1. ভারী মনোরম আলোচনা। অনেক কিছু শেখার-জানার থাকে এমন লেখায়। আন্তরিক ধন্যবাদ শ্রদ্ধেয় লেখককে। বইটা পড়ার আগ্রহ হচ্ছে ভীষণ।

    ReplyDelete
  2. যেমন উপন্যাস তেমন আলোচনা। মানে দুটোই রদ্দিমার্কা। আপনাদের কার্যকলাপে হাসি পায়।

    ReplyDelete

একনজরে

সম্পাদকীয়

সাহিত্য সমালোচনা- এই শব্দটিকে যদি ভেঙে দেয়া হয়, তাহলে অবধারিতভাবেই দুটো শব্দ চোখের সামনে ভেসে ওঠে। সাহিত্য ও সমালোচনা। সাহিত্যের সমা...

পছন্দের ক্রম